ঢাকা: দেশের চলমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটে ভোগান্তিতে থাকা সাধারণ মানুষ ও শিল্প-কারখানার মালিকদের কাছে দলের পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশ করেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তিনি বলেছেন, দেশের মানুষ বর্তমানে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটে কষ্ট পাচ্ছে—সরকার তা অস্বীকার করছে না। তবে অতীত সরকারের রেখে যাওয়া সংকটকে অজুহাত হিসেবে দেখিয়ে দায় এড়াতে চান না তারা। ভবিষ্যতে যাতে কোনো বৈশ্বিক বা অভ্যন্তরীণ সংকটে দেশের মানুষকে একই ধরনের জ্বালানি সমস্যায় পড়তে না হয়, সে জন্য সরকার দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করছে।
শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) বিকেলে রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
তারেক রহমান বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ভঙ্গুর অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও যোগাযোগ ব্যবস্থার পাশাপাশি বহুবিধ সমস্যা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে। এর মধ্যে বর্তমানে সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হচ্ছে জ্বালানি সংকট।
তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে জ্বালানির সমস্যা। বাংলাদেশের মানুষ এই মুহূর্তে বহু মানুষ বিদ্যুতের কষ্ট পাচ্ছে, জ্বালানির ক্ষেত্রে কষ্ট পাচ্ছে। আমরা সেটা অস্বীকার করছি না।’
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটে থাকা মানুষের কাছে দুঃখ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আজকে যেহেতু বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল এই মুহূর্তে দেশ পরিচালনার দায়িত্বে আছে, আজকে বহু মানুষ, বহু শিল্প-কলকারখানার মালিকসহ সাধারণ বহু মানুষ যে বিদ্যুতের কষ্টে বা জ্বালানি কষ্টে আছেন, তাদের সকলের কাছে আমি দলের পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশ করছি।’
তবে একই সঙ্গে অতীতের সংকটকে শুধু অজুহাত হিসেবে তুলে ধরে সরকার দায় এড়াতে চায় না বলেও জানান তিনি।
তারেক রহমান বলেন, স্বৈরাচারী সরকারের রেখে যাওয়া সমস্যার কারণে আজ দেশ ও দেশের মানুষ কষ্ট ভোগ করছে। কিন্তু সরকার শুধু এটিকে ‘এক্সকিউজ’ হিসেবে তুলে ধরতে চায় না। বরং সমস্যার বাস্তবতা জনগণের সামনে তুলে ধরে এমন পদক্ষেপ নিতে চায়, যাতে ভবিষ্যতে মানুষকে আর এ ধরনের সমস্যার মধ্যে পড়তে না হয়।
তিনি বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার হিসেবে বিএনপি একটি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নে সময় প্রয়োজন। ভবিষ্যতে বিশ্বে আবারও বিভিন্ন ধরনের সংকট তৈরি হলেও যাতে বাংলাদেশকে জ্বালানি সংকটে পড়তে না হয়, সে লক্ষ্যেই সরকার কাজ করছে।
সংকটকে পুঁজি করে অরাজকতার চেষ্টা
দেশের চলমান সংকটকে পুঁজি করে কিছু রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তি বিভ্রান্তি ছড়িয়ে দেশে অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ করেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, গত কিছুদিন ধরে সরকার লক্ষ্য করছে, স্বৈরাচারী আমল কিংবা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রেখে যাওয়া বিভিন্ন সমস্যা তারা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছেন। এসব সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চলছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমস্যা রয়েছে—এ কথা সরকার কখনোই অস্বীকার করছে না।
তারেক রহমান বলেন, ‘কিন্তু এসব সমস্যাগুলোকে পুঁজি করে আমরা খেয়াল করছি যে, কিছু রাজনৈতিক দল, কিছু ব্যক্তি বিভিন্নভাবে বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা করছেন এবং বিভ্রান্তি তৈরির মাধ্যমে দেশে একটি অরাজকতা তৈরি করার চেষ্টা করছেন।’
সরকারের অবস্থান তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশের জনগণ সরকারকে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে। সরকার গণতন্ত্রের ধারাকে সমুন্নত রাখবে এবং গণতান্ত্রিক নীতি-নৈতিকতা সর্বোচ্চভাবে অনুসরণ করবে। SouthAsians & Diaspora
তবে কেউ অরাজকতা সৃষ্টি করতে চাইলে দেশের আইন অনুযায়ী তা নিয়ন্ত্রণ করা হবে বলে সতর্ক করেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘সরকার হিসেবে এবং শুধু সরকার হিসেবে নয়, জনগণের দ্বারা একটি নির্বাচিত সরকার হিসেবে পরিষ্কারভাবে বলতে চাই—প্রত্যেকে প্রত্যেকের সীমার মধ্যে থাকা দরকার।’
‘স্বৈরাচারের গুপ্তদের অরাজকতা উসকে দেওয়ার চেষ্টা’
স্বৈরাচারী আমলে একটি রাজনৈতিক দল গুপ্তবেশ ধারণ করে ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে যুক্ত ছিল বলে মন্তব্য করেন তারেক রহমান।
তিনি বলেন, ‘স্বৈরাচারের সময় আমরা দেখেছি, একটি রাজনৈতিক দল গুপ্তবেশ ধারণ করেছিল। তারা স্বৈরাচারের ভেতরে গুপ্তভাবে লুকিয়েছিল। পরবর্তীতে আমরা দেখছি তাদের নিজেদের লোকজনই বেরিয়ে এসে নিজেরাই স্বীকার করেছে।’
বর্তমানে কিছু রাজনৈতিক দল বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে দাবি করে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, এই বিভ্রান্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষ যে স্বৈরাচারকে বিতাড়িত করেছে, তারাও অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে।
তিনি প্রশ্ন রাখেন, স্বৈরাচারের সময়ে যারা গুপ্তভাবে লুকিয়ে ছিল, এখন কি সেই গুপ্তদের ভেতরে স্বৈরাচার লুকিয়ে থেকে অরাজকতা উসকে দেওয়ার চেষ্টা করছে?
তারেক রহমান বলেন, যদি তা-ই হয়, তাহলে যারা গুপ্ত তারা সেই স্বৈরাচারকেই আবার সামনে নিয়ে আসার কাজ করছে। কয়েকদিন আগে গুপ্তদের একজন নেতা এমন বক্তব্য দিয়েছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
নেতা-কর্মীদের জনগণকে সচেতন করার আহ্বান
জাতীয়তাবাদী শক্তির সব নেতা-কর্মীকে জনগণকে আরও সচেতন করার আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান।
তিনি বলেন, কে কাকে মুক্ত করার দায়িত্ব নিচ্ছে, সেটি জনগণের সামনে উন্মুক্ত করে দিতে হবে।
তারেক রহমান বলেন, ‘এই যে গুপ্ত বাহিনী—এরা একাত্তর সাল থেকে আমরা দেখেছি, বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ বিভিন্ন সময়-অসময়ে একজন আরেকজনকে আড়াল করেছে, একজন আরেকজনকে আশ্রয় দিয়েছে।’
১৯৭১, ১৯৮৬, ১৯৯৬, গত এক যুগ এবং বর্তমান সময়েও বিভিন্ন পক্ষ একে অন্যকে আড়াল করে আসছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘আজ তাদের এই রাজনীতি জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে, জনগণকে পরিষ্কার করে দিতে হবে।’
‘বিএনপিকে মুছে ফেলা যাবে না’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত একটি আলোচনার প্রসঙ্গ তুলে তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার সঙ্গে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভূমিকা জড়িত। আইন-আদালতসহ কোনোভাবেই বিএনপিকে মুছে ফেলা যাবে না।
তিনি বলেন, ‘বিএনপি কীভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সঙ্গে জড়িত—বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এই দেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে। এটাকে কোনভাবে যে যতই চেষ্টা করুক, আইন-আদালত যা দিয়ে চেষ্টা করুক, কোনভাবেই এটাকে মুছে ফেলা যাবে না।’
স্বাধীনতার পর দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে একদলীয় বাকশাল ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দায়িত্ব পাওয়ার পর বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন।
তারেক রহমান বলেন, জিয়াউর রহমানের বহুদলীয় গণতন্ত্র, মুক্তবাজার অর্থনীতি ও বিদেশে শ্রমবাজার সৃষ্টির উদ্যোগ এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সংসদীয় গণতন্ত্র, টেকসই গণতন্ত্র, নারীশিক্ষার উন্নয়ন, বিকাশমান অর্থনীতি ও নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার পালাবদলের ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ভূমিকা রয়েছে। ExecutiveBranch
তিনি বলেন, দেশের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক মুক্তিসহ বিভিন্ন সংকটকালীন সময়ে জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া ও বিএনপি দেশকে সামনে এগিয়ে নিয়েছে।
‘২৪-এর আন্দোলনের সফলতার মাস্টারমাইন্ড জনগণ’
২০২৪ সালের আন্দোলনের সফলতার ‘মাস্টারমাইন্ড’ দেশের জনগণ বলে মন্তব্য করেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, জনগণকে সঙ্গে নিয়ে বিএনপি ওই আন্দোলন সফল করেছিল। পরবর্তীতে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রত্যাশা ছিল বাংলাদেশের মানুষের। নির্বাচন সামনে আসার পর দেশের জনগণই সবকিছুর সাক্ষী হয়েছে।
নিজেদের সীমাবদ্ধতার কথাও স্বীকার করেন বিএনপি চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, ‘আমাদের অনেক লিমিটেশনস ছিল, আমাদের লিমিটেশন বর্তমানেও আছে। আমরা চেয়েছি অনেক কিছু। ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন কারণে হয়তো আমরা সেটি সফল হতে পারিনি ক্ষেত্রবিশেষে।’ তারপরও দেশের মানুষের স্বার্থ রক্ষায় বিএনপিই কাজ করে বলে দাবি করেন তিনি।
তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে জনগণ যুগের পর যুগ বিএনপির ভূমিকা দেখেছে। দেশ ও আন্তর্জাতিকভাবে যেসব নির্বাচন তুলনামূলকভাবে নিরপেক্ষ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে, সেসব নির্বাচনে বিএনপি জনগণের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করতে সক্ষম হয়েছে।
কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গড়ার প্রত্যয়
দেশকে গণতান্ত্রিকভাবে পরিচালনা এবং মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করাই বিএনপির অন্যতম লক্ষ্য বলে জানান তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘আমরা বরাবরই চেষ্টা করেছি, আমাদের দলের সৃষ্টির প্রথম থেকেই আমাদের চেষ্টা হচ্ছে, আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে দেশকে একটি গণতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত করা, দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারকে সমুন্নত রাখা।’
গণতন্ত্রের জন্য দলের বহু নেতা-কর্মী জীবন উৎসর্গ করেছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিএনপি একই সঙ্গে একটি মানবিক ও কল্যাণমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা একটি এমন গণতন্ত্র দেশে রাখতে চাই, যেখানে প্রত্যেকটি মানুষ বলার জন্য কোনো রকম বাধা দেওয়া হবে না।’
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর সভাপতিত্বে এবং প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দীন টুকুর সঞ্চালনায় আলোচনা সভাটি অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় অর্থনীতিবিদ মাহবুবউল্লাহ, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, আমানউল্লাহ আমান, ফরহাদ হালিম, ইসমাইল জবিহউল্লাহ, জাতীয়তাবাদী যুব দলের সভাপতি এম মোনায়েম মুন্না, জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম বাবুল, জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক রাজীব আহসান, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্যসচিব তানভীর আহমেদ রবিন, উত্তর মহানগরের সদস্যসচিব মোস্তফা জামান এবং জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব বক্তব্য দেন।
এ ছাড়া বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আবদুল মঈন খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, সেলিমা রহমান, এজেডএম জাহিদ হোসেনসহ দলের কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
আলোচনা সভার শুরুতে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান, দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ দলের প্রয়াত ও শহীদ নেতা-কর্মীদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। পরে জাতীয় সংগীত ও দলীয় সংগীত পরিবেশন করা হয় এবং বিএনপির ওপর একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়।
উল্লেখ্য, ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। দলটির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে গত মঙ্গলবার শুরু হওয়া পাঁচ দিনের কেন্দ্রীয় কর্মসূচি এই আলোচনা সভার মধ্য দিয়ে শেষ হয়।